অর্থ সংকটে মাদ্রাসা শিক্ষক কর্মচারীর বেতন বন্ধ
মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত ২ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী এখনো মে মাসের বেতন পাননি। এর ফলে নিদারুণ অর্থ কষ্টের মধ্যে পড়েছেন তারা। কেন বেতন হচ্ছে না, তা জানতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রতিদিনই ভিড় করছেন অনেক শিক্ষক। বিষয়টি গড়িয়েছে সংসদ পর্যন্তও। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) জটিলতায় বেতন বন্ধ রয়েছে শিক্ষকদের। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূলত অর্থ সংকটের কারণে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। বকেয়া বেতন চলতি অর্থবছরের দেওয়া সম্ভব নয়। আগামী অর্থবছরে জুলাইয়ের শুরুতে একসঙ্গে ২ মাসের বেতন পাবেন তারা।
সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার পূর্বে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন প্রস্তুত করা হয়েছিল। ঈদের ছুটি শুরুর পূর্বেই সেটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা থাকলেও নানা কারণে পাঠানো হয়নি। ঈদের ছুটি শেষে জুন মাসে বেতনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও ফান্ডে টাকা না থাকায় বেতনের প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনের জন্য ৫১১ কোটি টাকা প্রয়োজন। ফান্ডে আছে মাত্র ৮৬ কোটি টাকা। এই অর্থ সংকটের কারণেই শিক্ষকদের মে মাসের বেতন দেওয়া যায়নি। কেন এই অর্থ সংকট দেখা দিল— এমন প্রশ্নের জবাবে এক কর্মকর্তা বলেন, চলতি অর্থবছরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন খাতে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এরপর সম্পূরক বাজেটের ১১১ কোটি টাকা চাওয়া হলেও বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫০০ কোটি টাকা। যা চাহিদার তুলনায় কম। আবার চলতি অর্থ বছরে ১৭ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বেতনের পাশাপাশি ইনসেটিভ, বোনাস, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও নতুন করে কোনো বরাদ্দ বাড়েনি। ফলে এই বাজেট ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন-ভাতার অর্থ ছাড় করতে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার জন্য এরই মধ্যে একাধিকবার অর্থ বিভাগের সচিব বরাবর ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। তবে এই অর্থ চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এজন্য আগামী অর্থবছরের বাজেট পাওয়ার পর মে এবং জুন দুই মাসের বেতন একসঙ্গে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ জুলাই মাসের শুরুতে বণ্টন শুরু হবে। নতুন করে কোনো অর্থ ছাড় দেওয়ার চিন্তাভাবনা আপাতত তাদের নেই।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক জন কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর নভেম্বর মাসে সম্পূরক বাজেট হয়। সেখানে নিয়োগসহ অন্যান্য বিষয় থাকে। ফলে কার বিভাগে বেতন-ভাতা বাবদ কত টাকা লাগবে, সেটি তখনই উল্লেখ করতে হয়। আমরা সেই হিসেবে চাহিদা দিয়েছিলাম কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয়নি। যদি প্রয়োজন মতো বরাদ্দ দিত, তাহলে এ সংকট তৈরি হতো না।
এ প্রসঙ্গে জানতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. উবায়দুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। এমনকি অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষকরা বেতন না পাওয়ায় সম্প্রতি জাতীয় সংসদে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মো. নুরুল আমীন বলেছেন, জুন মাসের ১৬ তারিখেও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষককে বেতন দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন শিক্ষক টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসা করতে পারছেন না। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’ এরপর অর্থ সংকটের বিষয়টি পাশ করিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ইএফটি জটিলতার কারণে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। দ্রুততম সময়ে নিরসনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষকরা মে মাসের বেতন এখনো পাননি। দীর্ঘদিন আগে ২০১৭ সালে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নামে ১টি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা আজও সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। শুরুতে প্রায় ১০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বর্তমানে প্রায় ৮০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে; তবুও প্রকল্পটি কার্যকরভাবে শেষ হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে এর মেয়াদ ও ব্যয়ই শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে, বিশেষ করে বিগত সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১৭ হাজার মাদ্রাসা শিক্ষকের বেতন প্রদানে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যেহেতু স্বয়ংক্রিয় ফান্ড ট্রান্সফার ব্যবস্থাটি পুরোপুরি চালু ছিল না, তাই মাসিক বেতন বরাদ্দ পরিকল্পনায় যথাযথ হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ তাদের এ ধারণাটা ছিল না যে, কি পরিমাণ টাকা মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতনের জন্য বরাদ্দ করতে হবে।
ড. মিলন আরও বলেন, আমাদের কাছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ ছিল। ওই ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ অর্ধেকের মতো, কেউ অর্ধেক নয়—প্রায় চার ভাগের এক ভাগের মতো পাবে, আর বাকিরা পাচ্ছে না। সেটা আমরা জুলাই মাসে এসে সবার বেতন পরিশোধ করব।

