ছাত্রীশূন্য বিদ্যালয়ে ৮ শিক্ষক, ২ কর্মচারীর বেতন-ভাতা সংবাদ প্রকাশের পর শোকজ, তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের শংকরকাটি খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে বাস্তবে কোনো ছাত্রী না থাকার অভিযোগের মধ্যেই ৮ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা উত্তোলন অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্তের আওতায় এনেছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়।

গত ২০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে শোকজ করা হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পাঠ্যপুস্তক গ্রহণ, উপবৃত্তি, শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য, বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সন্তোষজনক জবাব চাওয়া হয়েছে।

Left

শিক্ষা অফিসের স্মারক নং ৩৭.০২.৮৭৮৬.০০০.০১.২০২৬/১১৮৮-এর ওই নোটিশের অনুলিপি শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, নেই কোনো ছাত্রী

এর আগে বিদ্যালয়টি নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানজুড়ে অনেকটা সুনসান পরিবেশ দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষগুলো ছিল ফাঁকা। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কয়েকজন শিক্ষক ও দুই কর্মচারীর উপস্থিতি দেখা গেলেও কোনো শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি।

অথচ বিদ্যালয়ের নথিপত্রে ১২২ জন ছাত্রীর তথ্য থাকার কথা জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে ১০ জন ছাত্রী উপবৃত্তি পাচ্ছে। ফলে নথিতে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যা, উপবৃত্তির তালিকা এবং বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম, কোনো কোনো সময় নেই বললেই চলে। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। এতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকটের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের আল আজাদ-এর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনারা রিপোর্ট করলেও আমাদের কিছু হবে না। সরকার অন্যত্র বদলি করে দেবে—এমন বিধান আছে।”

তবে শিক্ষার্থী সংকট কাটাতে স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, মতবিনিময় কিংবা নতুন ছাত্রী ভর্তি বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক বলেন, “আমি হাতে-পায়ে ধরে শিক্ষার্থী আনতে পারব না।”

শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ইংরেজি শিক্ষক মনোরঞ্জন কুমার মণ্ডল, বাংলা শিক্ষক জাহিদ আলম এবং সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক কাজল কুমার দেবনাথসহ কয়েকজনের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের গাফিলতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান সংকটে পড়েছে।

তবে শিক্ষকদের এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠাতার দাবি, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল জব্বার পৈয়াদা বলেন, শিক্ষকদের অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের পথে। তাঁর দাবি, ১৯৮৭ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালে এমপিওভুক্ত হয়।

তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা পেলেও শিক্ষার্থী না থাকায় প্রতিষ্ঠানের মূল শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন এবং সরকারি অর্থে বেতন-ভাতা গ্রহণের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) বলেন, “বিদ্যালয়টিতে কোনো ছাত্রী নেই—বিষয়টি আমি জানি। প্রধান শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে সুস্পষ্ট জবাব দাখিল করতে বলা হয়েছে।”

এদিকে স্থানীয় ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—যদি বাস্তবে বিদ্যালয়ে ছাত্রী না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এমপিও সুবিধা কীভাবে অব্যাহত রয়েছে?

তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, শ্রেণিভিত্তিক উপস্থিতি, উপবৃত্তির তালিকা, ভর্তি রেজিস্টার, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন এবং সরকারি বেতন-ভাতা প্রদানের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শোকজের জবাব পাওয়ার পর শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। ছাত্রীশূন্যতার অভিযোগের পেছনে প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনাগত কোনো অনিয়ম রয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো বাস্তব কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।

ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে: বিদ্যালয়ের কাগজপত্রে থাকা শিক্ষার্থী, উপবৃত্তির তালিকা ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আরও তথ্য তুলে ধরা হবে।

- Advertisement -

এই বিভাগের আরও সংবাদ