শ্যামনগরে ৫ অদম্য নারীর জীবন কাহিনী

আজিজুর রহমান শ্যামনগর প্রতিনিধি:

সমাজের কিছু নারী প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই এ যুদ্ধে পেয়েছেন জয়ের দেখা। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন অনেকে। কেউ নির্যাতিত ও অবহেলিত নারীদের প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন। কেউ শত বাধা পেরিয়ে নিজে হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে  ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ কার্যক্রমের আওতায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবসে উপজেলার পাঁচ অদম্য নারীকে পুরস্কার ও সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে।

Left

উপজেলার ৫ অদম্য নারী হলো- অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী শাহানাজ খাতুন সালমা, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী রেহানা পারভীন,  সফল জননী হাসিনা বেগম, নির্যাতনের দূস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী মেরিনা খাতুন ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন বিথীকা মন্ডল

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী শাহানাজ খাতুন সালমাঃ উপকূলের এক ছোট্ট গ্রাম হরিশখালী। চারদিকে নদী, কাঁকড়া আর জোয়ার-ভাটার জীবন। সেই গ্রামেরই এক সাধারণ গৃহবধূ শাহনাজ খাতুন সালমা। বাড়ি শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে। কিন্তু স্বপ্ন তার ছিল অসাধারণ। মাত্র ষোল বছর বয়সে বিয়ে। এসএসসি পাস করেও আর পড়াশোনা এগোয়নি। সংসারে স্বামী রবিউল ইসলাম, শাশুড়ি, দুই সন্তান সহ পাঁচ জনের পরিবার। স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় ঘরে অভাব, ছেলের পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে জীবন যেন থমকে ছিল। একদিন সালমা ভাবলেন, “এভাবে আর কতদিন?” ২০২১ সালে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি। পরিবার উন্নয়ন পরিকল্পনায় মূল সম্পদ হিসেবে একটি নৌকা নেন। নৌকাটি পাওয়ার পর স্বামী নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে আনতে শুরু করেন। সংসারের আয় একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সালমা শুধু বসে থাকেননি। নৌকার আয় থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমাতে লাগলেন। একসময় আট হাজার টাকা সঞ্চয় হলো। সেই টাকা দিয়ে নাজিমগঞ্জ বাজার থেকে সিট কাপড় কিনে বাড়িতে ছোট ব্যবসা শুরু করলেন। পুরনো একটি সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করতেন, আর ফাঁকে ফাঁকে সিট কাপড় বিক্রি করতেন। প্রথমদিকে লজ্জা, ভয় সবই ছিল। কিন্তু তার হাতের কাজ ছিল নিখুঁত। ধীরে ধীরে গ্রামের নারীরা পোশাক বানাতে তার কাছে আসতে শুরু করল। শিশুদের জামা, মেয়েদের থ্রি-পিস, নানান ডিজাইনের পোশাক সবকিছুতেই তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতে লাগল। কখনো সুন্দরবনের পাশ বন্ধ থাকায় স্বামীর আয় বন্ধ হলেও সালমার কাজ থামেনি। বরং তখনই তার উপার্জন সংসারের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু কাপড়ই নয়, অবসরে কাপড় আর কাগজ দিয়ে বানান শোপিস ফুলদানি, খেলনা, ট্রে। বাড়িতে ইনকিউবেটর মেশিনে মুরগির বাচ্চাও ফোটান। আজ সালমা আর আগের সেই নির্ভরশীল গৃহবধূ নন। তিনি একজন উদ্যোগী নারী, একজন সংগ্রামী মা, একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ। জোয়ার-ভাটার মতোই জীবনে এসেছে উত্থান-পতন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সাহসী মনোবল তাকে হারতে দেয়নি। উপকূলের ছোট্ট গ্রাম থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, তবে সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয়।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী রেহানা পারভীনঃ সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম রেহানা পারভীনের। এগারো ভাই-বোনের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। মায়ের হাত ধরে শিক্ষার শুরু। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্টার মার্কসহ এসএসসি এবং প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস সবই প্রাইভেট ছাড়াই। অভাবের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যায়। বিয়ের পরও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, স্বামীর বেকারত্ব, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন সব মিলিয়ে জীবন হয়ে ওঠে কঠিন। এর মধ্যেই তিন কন্যাসন্তানের জননী হন তিনি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে স্বামী হারিয়ে একাই সন্তানদের দায়িত্ব কাঁধে নেন। হাল না ছেড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে খুলনার ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজলাল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগে তিন মেয়েকে মানুষ করেন। আজ তাঁর বড় মেয়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধ্যয়ন করছে, আর দুই মেয়ে বয়রা সরকারি মহিলা কলেজ-এ পড়ছে। শ্বশুরবাড়ির অবহেলা সত্ত্বেও তিনি তিন মেয়ের জন্য আলাদা ভিটেমাটির ব্যবস্থা করেছেন। রেহানা হার মানেননি। সংগ্রামই তাঁর শক্তি। একজন নারী, একজন মা এবং একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই শেষ কথা নয়।

সফল জননী হাসিনা বেগমঃ জয়াখালী গ্রামের হাসিনা বেগমের বিয়ে হয় খুব অল্প বয়সে। স্বামী আব্দুস সামাদ ছিলেন স্বল্প আয়ের দিনমজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার। প্রথম সন্তান জন্মের পর অভাব আরও বাড়ে। তখন হাসিনা নিজেও স্বামীর সঙ্গে দিনমুজুরের কাজ শুরু করেন। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পরও থেমে থাকেননি। অন্যের বাড়িতে কাজের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করে ছেলেদের বড় করেন। স্বামীর মাত্র ১৫ শতাংশ জমি ছাড়া আর কোনো সহায়-সম্বল ছিল না। তবুও সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করান এবং কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনার খরচ জোগান। অশেষ কষ্ট আর ত্যাগের ফল আজ সার্থক। তাঁর বড় ছেলে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। ছোট ছেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স বিভাগে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। হাসিনা বেগম প্রমাণ করেছেন অভাব কখনো স্বপ্নকে থামাতে পারে না। মায়ের পরিশ্রম, ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই পারে সন্তানের ভবিষ্যৎ আলোকিত করতে।

নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবনসংগ্রামে জয়ী মেরিনা খাতুনঃ মেরিনা খাতুন একজন নির্যাতনের শিকার নারী, যিনি ভয়াবহ সহিংসতার বিভীষিকা পেছনে ফেলে নতুন করে জীবন গড়েছেন। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তাঁর বাল্যবিবাহ হয়। অল্পদিনের মধ্যেই সন্তান জন্ম নেয়। এরপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। স্বামী ছিলেন নেশাগ্রস্ত; সামান্য বিষয়েও মারধর করতেন। তবুও মেরিনা পড়াশোনা চালিয়ে যান। এসএসসি পাস করেন এবং এইচএসসিতে ভর্তি হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বামী তাঁর এসএসসি সনদ ছিঁড়ে ফেলেন, ঘরবন্দী করে রাখেন, এমনকি নৃশংসভাবে দুই হাতের আঙুল কেটে দেন। পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপ মারেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর প্রতিবেশীদের সহায়তায় তাঁর শরীরে মোট ৪০টি সেলাই দিতে হয়।এরপর সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসেন। নতুন করে জীবন শুরু করার সংকল্প নেন। কিন্তু নির্যাতন সেখানেও থামেনি। এক রাতে স্বামী চাইনিজ কুড়াল নিয়ে এসে তাঁকে ও তাঁর মাকে কোপান, শিশুসন্তানকে হত্যারও চেষ্টা করেন। গ্রামবাসীর চিৎকারে তিনি পালিয়ে যান। এই ঘটনার পর মেরিনা সাহসিকতার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করেন এবং আবার পড়াশোনা শুরু করেন। এইচএসসি পাস করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি দর্জির কাজ করে সন্তানদের ভরণপোষণ চালিয়ে যান।আজ তিনি উত্তরণ আইসিবিসি প্রকল্প-এ কর্মরত। নিজের পরিশ্রমে দুই ছেলেকে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন। বড় ছেলের বয়স ৯ বছর, ছোট ছেলের ৭ বছর।মেরিনা এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। তাঁর একটাই স্বপ্ন সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষ করা, যেন তারা সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।মেরিনার জীবন প্রমাণ করে নির্যাতন একজন নারীকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু তার ইচ্ছাশক্তি আর সাহস তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন বিথীকা মন্ডলঃ সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রমজাননগর গ্রামের মেয়ে বিথীকা রানী। দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। তখন তিনি শুধু পড়তে চান, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। তিনি সাহস করে বান্ধবীর বাবার কাছে সব খুলে বলেন ১৮ বছরের আগে, তাও বেকার ছেলেকে তিনি বিয়ে করবেন না।অনেক চেষ্টা করেও পরিবার বিয়ে বন্ধ করতে পারেনি। তখন বিথীকা নিজেই উদ্যোগ নেন। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানান। শেষ পর্যন্ত বাল্যবিবাহ বন্ধ হয় এবং তিনি মুক্তি পান। এরপর এইচএসসি পাস করেন এবং টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালান। এখন তিনি অনার্স কোর্স শেষ করার পথে।নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সমাজের অন্য মেয়েদের জন্য দাঁড়িয়েছেন। কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পেলেই সবার আগে এগিয়ে যান। কুসংস্কার দূর করতে ঝরে পড়া মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। দরিদ্র শিশুদের জন্য নিজ উদ্যোগে একটি ছোট স্কুল ঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা তিনি নিজেই দেখাশোনা করেন।অল্প বয়সীদের বিড়ি, মাদক ও নেশা থেকে দূরে রাখতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সভা-সমাবেশ আয়োজন করে সচেতনতা সৃষ্টি করছেন।বিথীকা বিশ্বাস করেন একজন মেয়ের সাহস পুরো সমাজ বদলে দিতে পারে। তাই তিনি থেমে নেই, আরও এগিয়ে যেতে চান।

শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, ‘আজকের এই অদম্য নারীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া অন্য নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের খুঁজে বের করে সম্মানিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের একটি অংশ। তাই আমরা চেষ্টা করেছি এই নারীদের ক্ষুদ্র হলেও সম্মানিত করার। আমাদের চেষ্টা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।’

- Advertisement -

এই বিভাগের আরও সংবাদ